আজ পহেলা মে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময়সীমার দাবিতে ১৮৮৬ সালের এ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে প্রাণ দিয়েছিলো অসংখ্য শ্রমিক। তারপর থেকে সারা বিশ্বে কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা করা হলেও খুলনাসহ রূপসায় অবস্থিত দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানিখাত হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে আজও ১২ ঘণ্টা রয়েছে কাজের সময়সীমা। সেই সাথে দেওয়া হচ্ছে না তাদের ন্যায্য মজুরি। মে দিবসে এসব শ্রমিকদের নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি আজও। এই শিল্পে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি।
চিংড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানে মূলত দুই শ্রেণির শ্রমিক রয়েছে। একটা গ্রুপ কোম্পানির মালিক পক্ষের নিয়োগ প্রাপ্ত এবং অপর গ্রুপ ঠিকাদারের অধীনে। মালিকের অধীনে যে-সব শ্রমিকরা কাজ করেন তারা মূলত বেতনভুক্ত হলেও নানা বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। চাকরির শুরুতে বেতন নির্ধারণ করা হয় ৭২০০ টাকা। বোনাস বলতে কোন কোন কোম্পানি দুই ঈদের একটিতে ফুল এবং অপরটিতে হাফ দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ কোম্পানিতে দুই ঈদেই হাফ বোনাস দেওয়া হয়। ঈদে বোনাস দিলেও একদিনের বেশি ছুটি জোটেনা। এছাড়া এসব শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের সময়সীমা কাগজে কলমে থাকলেও প্রতিদিন কাজ করতে হয় ১২ ঘণ্টা। বিশেষ ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো বিশেষ কারণে ছুটি কাটালে কর্তন করা হয় বেতন। কোনো কোনো সামান্য ত্রুটিতে শ্রমিকদের কোম্পানি থেকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। ৮ ঘণ্টার স্থলে ১২ ঘণ্টা কাজ করলেও দেওয়া হয় না কোনো ওভারটাইমের অর্থ। নেই বাড়তি কোনো সুবিধা।
অপরদিকে ঠিকাদারের অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের কেউ কেউ নূন্যতম বেতনে আবার কেউ কেউ কাজের উপর ভিত্তি করে মজুরি পেয়ে থেকে। তারা সাধারণত উৎপাদন বিভাগে মাছ গ্রেড, ঘাট লেবারি ও ক্যাজুয়ালি হিসেবে কাজ করে থাকে।
বিশেষ করে ঠিকাদারের অধীনে উৎপাদন বিভাগের গ্রেডারদের মণ হিসেবে যে মজুরি দেওয়া হয় বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী খুবই কম।
রূপসা ফ্রেস ফুডস লিঃ এর শ্রমিক মোঃ আরিফ আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের অধিকার আদায়ে সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। যেমন বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে নতুন অবস্থায় একজন শ্রমিককে ৭ হাজার ২০০ টাকা বেতন দিলে সে কীভাবে সংসার চালাবে? ঈদে একদিন ছুটি দেয়। অন্যান্য সরকারি ছুটি যেমন শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবসের ছুটিতে আমাদের ভাগ্যে কোনো ছুটি জোটেনা।
তিনি বলেন, ‘অনেক সেকশনে ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। কিন্তু কাগজে কলমে ৮ ঘণ্টা দেখায় স্যারেরা। যদিও আমাদের কোম্পানি মাসের ২৬ তারিখের মধ্যে বেতন দেয়। ঈদুল ফিতরে ফুল বোনাস এবং ঈদুল আযহা’য় হাফ বোনাস দিয়ে আসছে।’
অপর এক কোম্পানির উৎপাদন বিভাগের শ্রমিক সালমা খাতুন বলেন, ‘আমাদের স্বাভাবিক বেতন ৮ হাজার ৭০০ টাকা। এ টাকা দিয়ে বর্তমানে আমাদের সংসার ও ছেলে মেয়ের পড়াশোনা করাতে খুব কষ্ট হয়। তবুও মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এবং ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। বছরের পর বছর কাজ করলেও খুব একটা বেতন বাড়েনা।
আইকিউএফ’র নারী শ্রমিক শাহানা বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানি জগতে কাজ করছি। শুরুতে বেতন ছিলো ৩২০০ টাকা এখন তা হয়েছে ৯ হাজার ২০০ টাকা। ৫ সদস্যের পরিবারের ওই টাকা দিয়ে নূন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চিংড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে চিংড়ি উৎপাদন অনেকাংশে কমে এসেছে। এরপর আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করায় বিদেশি ক্রেতাদের মাঝে পণ্যের মান নিয়ে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও বা কোম্পানিগুলো অপদ্রব্য পুশকৃত মাছ ক্রয় করে না।
তিনি শ্রমিকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা বৈষম্য সম্পর্কে বলেন, এ জগতের শুরু থেকেই শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আমাদের সদিচ্ছা থাকলেও দীর্ঘদিনের এই বৈষম্য দূর করতে পারবো না। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
খুলনা গেজেট/এনএম

